ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের বিরুদ্ধে তাঁর বিচ্ছিন্ন সম্পর্কের মাকে দিয়ে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন করিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন ওহায়োর রিপাবলিকান গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামস্বামী। বিজ্ঞাপনটি ‘ভুল’ বলে তা সরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন ওহায়োর রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে তীব্র আক্রমণ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডিওয়াইনের বিরুদ্ধে দলের প্রতি অনুগত না থাকার অভিযোগ তুলে রামস্বামীকে উল্টে বিজ্ঞাপনটি চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ওহায়োর গভর্নর নির্বাচনে সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষাগুলিতে রামস্বামীর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন অ্যাক্টন। তাঁর সঙ্গে মা ডনা আর্থারের সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে বিচ্ছিন্ন। অ্যাক্টনের দাবি, তিনি যখন ১২ বছরের, তখন তাঁর মা এমন এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন, যিনি তাঁকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন। পুলিশ হস্তক্ষেপ করার পরেও ওই ব্যক্তির সঙ্গেই থেকে যান তাঁর মা।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ওহায়োর রাজধানীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিজ্ঞাপনটিকে ‘অত্যন্ত, অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেন ডিওয়াইন। তাঁর কথায়, “এই বিজ্ঞাপন চালানো অন্যায়।” রামস্বামীর প্রচারশিবিরের কাছে তাঁর আবেদন, বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেওয়া হোক।

মায়ের মুখে মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এই সপ্তাহের গোড়ায় সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিতর্কিত ভিডিওটি। পরে ওহায়োর সংবাদমাধ্যমগুলির কাছে রামস্বামীর প্রচারশিবির স্বীকার করে, বিজ্ঞাপনটি তাদেরই তৈরি। সেখানে অ্যামি অ্যাক্টনের মা ডনা আর্থারকে নিজের মেয়েকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলতে এবং তাঁর হাতে রাজ্যের দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করতে দেখা যায়।

বিতর্কের মধ্যেই সপ্তাহের পরের দিকে রামস্বামীর প্রচারশিবির জানায়, গোটা ওহায়ো জুড়ে বিজ্ঞাপনটি প্রচার করতে ৪০ লক্ষ ডলার খরচ করা হবে।

ডিওয়াইনের বক্তব্য, রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিবারের সদস্যদের সাধারণত আক্রমণের লক্ষ্য করা হয় না। তাঁর কথায়, “ঐতিহাসিকভাবে পরিবারের সদস্যদের সব সময়ই রাজনৈতিক আক্রমণের বাইরে রাখা হয়েছে।”

তবে এই বিতর্কে অ্যাক্টনের দিকেও আঙুল তুলেছে রামস্বামীর শিবির। চলতি বছরের গোড়ায় অ্যাক্টনও রামস্বামীর মায়ের বিরুদ্ধে ওঠা একটি ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। এই ধরনের কারসাজিতে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে পরে তা বিক্রি করে মুনাফা করা হয়। যদিও অ্যাক্টনের প্রচারে সেই বিষয়টি রামস্বামীর বিজ্ঞাপনের মতো গুরুত্ব পায়নি।

ডিওয়াইনকে ‘ডামোক্র্যাট’ খোঁচা ট্রাম্পের

বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজের সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ডিওয়াইনের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, ডিওয়াইন “রিপাবলিকান পার্টির প্রতি অনুগত নন”।

ডেমোক্র্যাটদের কটাক্ষ করে ‘ডামোক্র্যাট’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প লেখেন, ডিওয়াইন সম্ভবত একজন ডেমোক্র্যাটের জয় চান। তাঁর আরও অভিযোগ, ডিওয়াইন এমন কাউকে চান না, যিনি নিজের পক্ষে যতটা সম্ভব, তার চেয়ে অনেক ভাল কাজ করতে পারবেন।

অন্য দিকে, রামস্বামীকে বিজ্ঞাপনটি চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ট্রাম্প লেখেন, “একজন খুঁতেভরা, অসৎ ও অক্ষম প্রার্থীর মা কী বলছেন, তা সবাইকে শুনতে দিন।” অ্যাক্টনকে আক্রমণ করে তাঁর দাবি, বিজ্ঞাপনটি দেখাবে কী ভাবে তিনি মিথ্যা বলেন, প্রতারণা করেন এবং চুরি করেন। এগুলি ট্রাম্পের রাজনৈতিক অভিযোগ; স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্য নয়।

রামস্বামীর প্রচারশিবিরের মুখপাত্র কনি লাকও বিজ্ঞাপনের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর দাবি, ডেমোক্র্যাটরা যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র এবং অন্য রিপাবলিকান নেতাদের পরিবারের সদস্যদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করেছেন, তখন সংবাদমাধ্যমের সমালোচনায় দ্বিচারিতা রয়েছে।

ভ্যান্সের সায়, রিপাবলিকানদেরই আপত্তি

বুধবার সিনসিনাটিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিজ্ঞাপন নিয়ে সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে চাননি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর কথায়, বিজ্ঞাপনটি যথাযথ ছিল কি না, তা নিয়ে তাঁর বিশেষ মাথাব্যথা নেই।

ভ্যান্স আরও বলেন, ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার বদলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রিপাবলিকানরা এই বিজ্ঞাপন নিয়ে বেশি আপত্তি জানাচ্ছেন দেখে তাঁর বিরক্তি হয়। তাঁর মন্তব্য, রাজনীতি কঠিন জায়গা।

তবে দলের সব নেতাই যে বিজ্ঞাপনটির পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা নয়। রিপাবলিকান মার্কিন সেনেটর জন হুস্টেড এপিকে বলেছেন, “আমি হলে ওই বিজ্ঞাপন চালাতাম না।” আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর আসনের ফল সেনেটে কোন দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

হুস্টেডের ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রাক্তন সেনেটর শেরড ব্রাউন ভিডিওটিকে ‘ঘৃণ্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রত্যেক প্রার্থীরই বিজ্ঞাপনটির নিন্দা করা উচিত।

ওহায়োর রিপাবলিকান সেক্রেটারি অব স্টেট ফ্র্যাঙ্ক লারোজও একই সুরে সমালোচনা করেছেন। কলম্বাস এলাকার সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি ৬-কে তিনি বলেন, “আমি সম্ভবত এ ধরনের বিজ্ঞাপন চালাতাম না।” তবে তাঁর মতে, প্রত্যেক প্রার্থীরই নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

সমালোচনা সত্ত্বেও সমর্থন অটুট

বিজ্ঞাপনটির বিরোধিতা করলেও গভর্নর নির্বাচনে রামস্বামীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে রাজি হননি ডিওয়াইন। তিনি জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের গোটা প্রার্থী তালিকাকেই সমর্থন করতে চান।

ফলে বিতর্কটি এখন শুধু এক প্রার্থীর প্রচারকৌশল নিয়ে নয়, রিপাবলিকান দলের ভিতরে রাজনৈতিক শালীনতার সীমা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। এক দিকে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের মতো শীর্ষ নেতারা রামস্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, অন্য দিকে ডিওয়াইন-সহ দলের একাধিক নেতা বিজ্ঞাপনটির বিরোধিতা করেছেন। নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক ভোটারদের উপর কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেটাই দেখার।